২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার এবং শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ প্রস্তাব ও সুপারিশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে এসব পরিকল্পনা ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা খাতের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে। এটি আগের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বৈঠকে জানানো হয়।
এর আগে খুলনায় একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ট্যাব দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরে গত ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর মিডিয়া সেলের এক স্ট্যাটাসে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জনকারীদের ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ
শিক্ষা খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ইএফটি ও আইবাস++ পদ্ধতিতে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি তাঁদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের জন্য সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানানো হয়।
এ ছাড়া হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত পরিশোধের জন্য পৃথক তালিকা তৈরি এবং বাজেটের সংস্থান অনুযায়ী বকেয়া ভাতা প্রদানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে সাত দফা সুপারিশ
শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে সংসদীয় কমিটি সাত দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বছরভিত্তিক শিখনফল পরিমাপের ব্যবস্থা চালু, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো।
পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ড ও অধীনস্থ দপ্তরের প্রধানদের সংসদীয় কমিটির পরবর্তী বৈঠকগুলোতে উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের কৌশল নির্ধারণ, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে প্রথম সভায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে দেশের শিক্ষার্থীদের সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে নিতে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন ও আধুনিক শিক্ষাক্রমের বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, শুধু বছর শেষে নয়, তিন বা ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থীদের শিখনফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পরবর্তী সভাগুলোতেও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে সুপারিশ করা হবে। এ ছাড়া শিক্ষার রোডম্যাপ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রচলিত শিক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়। কমিটির সদস্যরা মনে করেন, শুধু পাসের হার বৃদ্ধি শিক্ষার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা কতটা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছে, তা পরিমাপের জন্য বছরভিত্তিক মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম চালু করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার মডেলের আদলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, সরকার বা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো যেন বারবার পরিবর্তিত না হয়।
বৈঠকে কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য সুনির্দিষ্ট ও বছরভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রবর্তন জরুরি।
শিক্ষাবিদদের মতে, পাসের হারনির্ভর মূল্যায়নের পরিবর্তে শিখনফল, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া হলে শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের পথ সুগম হতে পারে। সংসদীয় কমিটির প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতার ওপর।