একসময় আলুর মাঠজুড়ে ছিল ফলনের আশা, আর বাজারে ছিল ভালো দামের প্রত্যাশা। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজারদরের ওঠানামায় সেই আশাই পরিণত হয় লোকসানে। পুঁজি হারিয়ে অনেক কৃষক যখন দিশেহারা, তখন বিকল্প ফসল হিসেবে কলা চাষে ঝুঁকেছেন নীলফামারীর কৃষকেরা। কম ঝুঁকি ও তুলনামূলক ভালো লাভের কারণে ধীরে ধীরে বাড়ছে বাণিজ্যিক কলার আবাদ। সবুজে ছেয়ে যাওয়া মাঠে এখন দেখা মিলছে কৃষকের নতুন আশার।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারী সদর, কিশোরগঞ্জ ও জলঢাকা উপজেলায় একসময় ব্যাপকভাবে আগাম আলু চাষ হতো। তবে গত দুই বছরে অনুকূল আবহাওয়ার অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষককে লোকসান গুনতে হয়েছে। এতে বিকল্প ও তুলনামূলক কম ঝুঁকির ফসলের দিকে নজর দেন তাঁরা। এরই ধারাবাহিকতায় রবি ও খরিফ মৌসুম মিলিয়ে চলতি বছরে জেলায় প্রায় ৫২০ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।
জেলায় বাণিজ্যিকভাবে সাগর, চাঁপা, জি-৯, কাঁচা কলা, বারি-১, বারি-২, বারি-৩, বারি-৪, অমৃতসাগর, মেহেরসাগর, অগ্নিশ্বর, দুধসর, মালভোগ ও কাঠালীসহ বিভিন্ন জাতের কলা চাষ হচ্ছে।
নীলফামারী সদর উপজেলার যাদুরহাট এলাকার কৃষক আলামিন (৪০) বলেন, “অন্যান্য দানাদার বা মৌসুমি ফসলের মতো কলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয় তুলনামূলক কম। একবার চারা রোপণ করলে দীর্ঘ সময় ফলন পাওয়া যায়। এ কারণে কলা চাষে আগ্রহী হয়েছি।”
কিশোরগঞ্জ উপজেলার উত্তর দুড়াকুটি গ্রামেও দেখা গেছে একই চিত্র। ওই গ্রামের কৃষক দেলোয়ার রহমান দুলাল (৪২) গত বছর ১৬ বিঘা জমিতে দেশি জাতের মালভোগ কলা চাষ করেন। আলুর আবাদ কমিয়ে কলা চাষ করে তিনি প্রতি বিঘায় প্রায় দেড় লাখ টাকা লাভ করেন বলে জানান। এতে উৎসাহিত হয়ে চলতি মৌসুমে আরও তিন বিঘা জমি বাড়িয়ে মোট ১৯ বিঘায় কলার আবাদ করেছেন তিনি।
শুধু কৃষকের আয়েই নয়, কলা চাষের বিস্তার প্রভাব ফেলছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। জলঢাকা উপজেলার মীরগঞ্জ এলাকার কৃষক রুস্তম আলী বলেন, “কলা কাটার পর পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই কিনে নেন। ফলে আমাদের বাড়তি পরিবহন খরচ লাগে না।”
স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি প্রতিদিন ট্রাকযোগে নীলফামারীর কলা যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে। কলার বেচাকেনা বাড়ায় স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে নতুন আড়ত। পাশাপাশি পরিবহন ও শ্রমিকনির্ভর বিভিন্ন কাজে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
কৃষকের বাড়তি আয়ের আরেকটি পথও তৈরি হয়েছে কলাবাগানে। কলার সারির ফাঁকে সাথি ফসল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করছেন অনেকে। এতে একই জমি থেকে কলার পাশাপাশি বাড়তি অর্থও পাচ্ছেন তাঁরা।
কৃষকদের কলা চাষে আগ্রহ বাড়ার পেছনে কৃষি বিভাগের পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও পরিচর্যার বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়রা মন্ডল বলেন, “এবার জেলায় কলার বাম্পার ফলন হয়েছে। আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমনে নিয়মিত দিকনির্দেশনা দিচ্ছি। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের নিরলস পরিশ্রমে কলা চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।”
আলুর বাজারে লোকসানের ধাক্কা সামলে এখন কলার সবুজ পাতায় নতুন সম্ভাবনা দেখছেন নীলফামারীর কৃষকেরা। লাভজনক বাজার, সহজে বিক্রির সুযোগ এবং একই জমিতে সাথি ফসলের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে জেলার কৃষিতে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বাণিজ্যিক কলা চাষ।