শিরোনাম

সৈয়দপুরে একই পরিবারের চার প্রতিবন্ধী সন্তান, অসহায় বাবা-মায়ের দিন কাটে সংগ্রামে

সৈয়দপুরে একই পরিবারের চার প্রতিবন্ধী সন্তান, অসহায় বাবা-মায়ের দিন কাটে সংগ্রামে

নীলফামারীর সৈয়দপুরের উত্তরা আবাসন প্রকল্পের ছোট্ট একটি ঘরে চার প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন শাহজাদা আশরাফি ও ফারজানা বেগম দম্পতি। ভ্যান চালিয়ে বাবা এবং অন্যের বাড়িতে কাজ করে মা কোনোভাবে সংসার চালালেও বয়স ও দারিদ্র্যের কারণে সন্তানদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা দিতে পারছেন না তাঁরা। একমাত্র সুস্থ সন্তান রাজিবও পরিবারের এই দুর্দশা থেকে মুক্ত নয়।

শাহজাদা-ফারজানা দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিন মেয়ে ও এক ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার। তাঁরা হলেন—শাহানা বেগম (২২), শাহানাজ বেগম (২০), মমতা বেগম (১৭) ও আব্দুল কাদির (১৫)। তাঁদের আরেক ছেলে রাজিবের বয়স ১২ বছর এবং সে সুস্থ।

চার সন্তানের হাত-পা অস্বাভাবিক হওয়ায় তাঁরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে অন্যের সহায়তা ছাড়া খাওয়া-দাওয়া ও দৈনন্দিন কাজও করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না হওয়ায় বয়স বাড়ার সঙ্গে তাঁদের শারীরিক সমস্যাও আরও প্রকট হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

উত্তরা আবাসন প্রকল্পটি গৃহহীন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের জন্য নির্মিত। সেখানকার ছোট্ট দুটি কক্ষের একটি ঘরে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন শাহজাদা আশরাফি। তিনি পেশায় ভ্যানচালক। স্ত্রী ফারজানা বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।

ফারজানা বেগম জানান, বড় মেয়ে শাহানার জন্মের সময়ই তাঁর দুই পা বাঁকা ও চিকন ছিল। তখন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংসারে অভাব থাকায় আর চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া আরও তিন সন্তানও একই ধরনের শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়।

তিনি বলেন, সন্তানদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেখাশোনার দায়িত্বও বেড়েছে। একদিকে সন্তানদের সার্বক্ষণিক পরিচর্যা, অন্যদিকে সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে চরম সংকটে রয়েছেন।

ফারজানা আরও বলেন, আগে তাঁরা সৈয়দপুর শহরের পুরাতন বাবুপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। মা মারা যাওয়ার পর প্রায় ১৬ বছর ধরে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে আবাসন প্রকল্পের বরাদ্দ পাওয়া বাড়িতে বসবাস করছেন। বয়স বেড়ে যাওয়ায় স্বামীও আগের মতো ভ্যান চালাতে পারেন না। সংসারের খরচ ও সন্তানদের দেখাশোনার জন্য বিভিন্ন সময় এনজিও, স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এতে তাঁরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

চার সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে শাহানা বেগম সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মায়ের বয়স হয়েছে। তাঁকে সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়। বাবাও আগের মতো আয় করতে পারেন না। সরকার যদি তাঁদের পরিবারের জন্য কোনো সহায়তার ব্যবস্থা করত, তাহলে বাবা-মায়ের কষ্ট কিছুটা কমত।

প্রতিবেশী আরমান হোসেন ও সুমি আক্তার বলেন, চার প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিপাকে রয়েছেন শাহজাদা ও ফারজানা। অভাব-অনটনের কারণে অনেক সময় তাঁদের খাবার জোগাড় করতেও কষ্ট হয়। বড় মেয়ে শাহানা কিছুটা পড়াশোনা করেছেন। তাঁর জন্য প্রতিবন্ধী কোটায় কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে পরিবারটি উপকৃত হতো।

শাহজাদা আশরাফি বলেন, ‘আমি অসহায় বাবা। সন্তানদের জন্য অনেক কিছু করতে চাই, কিন্তু সামর্থ্য নেই। এখন ঠিকমতো ভ্যানও চালাতে পারি না। অনেক সময় অন্যের সহায়তায় একবেলা খাবার জোটে। সন্তানদের চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকি।’

পরিবারটির অসহায়ত্বের বিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাহ ফাতেহা তাকমিলা বলেন, প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে কোনো পরিবার কষ্টে রয়েছে—এমন তথ্য তাঁর জানা ছিল না। পরিবারটি আবেদন করলে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে।

চার প্রতিবন্ধী সন্তানকে ঘিরে শাহজাদা-ফারজানা দম্পতির দিন কাটছে অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামে। সন্তানদের চিকিৎসা, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—তাঁদের অবর্তমানে সন্তানদের কী হবে। সরকারি সহায়তা ও সামাজিক সহযোগিতাই এখন পরিবারটির কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর