প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে যাতায়াতের দুর্ভোগ কমাতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ। জেলা পরিষদের প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম হাবিব দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৭০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে বাইসাইকেল তুলে দেওয়া হয়েছে।
জেলা পরিষদ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার দেওয়ার কর্মসূচি নয়। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের কষ্ট কমানো, তাদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় করা এবং পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে তোলাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভালো ফলাফলের জন্য ইতিবাচক প্রতিযোগিতাও তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) কলারোয়া সরকারি জি.কে.এম.কে পাইলট হাইস্কুল চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপজেলার আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮০ জন শিক্ষার্থীর হাতে বাইসাইকেল তুলে দেওয়া হয়। এর দুই দিন পর শনিবার (৩ অক্টোবর) সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত আরেক অনুষ্ঠানে আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরও ৯০ জন শিক্ষার্থীকে বাইসাইকেল দেওয়া হয়।
জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শ্রেণির প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীর জন্য দুটি করে বাইসাইকেল বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কলারোয়ার আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—কলারোয়া সরকারি জি.কে.এম.কে পাইলট হাইস্কুল, গার্লস পাইলট হাইস্কুল, মডেল হাইস্কুল, বেত্রবতী হাইস্কুল, সোনাবাড়িয়া হাইস্কুল, বামনখালী হাইস্কুল, চন্দনপুর হাইস্কুল ও কাজিরহাট হাইস্কুল। এসব প্রতিষ্ঠানের ৪৩ জন ছাত্রী ও ৩৭ জন ছাত্রের হাতে মোট ৮০টি বাইসাইকেল তুলে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে জেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯০ জন শিক্ষার্থী বাইসাইকেল পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সরকারি কালিগঞ্জ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আশাশুনি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আশাশুনি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, বুধহাটা বাহাদুরপুর ভূবন মোহন কলেজিয়েট স্কুল, নকিপুর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, নকিপুর সরকারি হরিচরণ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ঈশ্বরীপুর আব্দুস সোবহান মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
বাইসাইকেল পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের ভাষ্য, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াতে দীর্ঘ সময় ও শারীরিক শ্রম ব্যয় হয়। অনেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ পথ হেঁটেই বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বাইসাইকেল পাওয়ায় যাতায়াতের সময় কমবে এবং সাশ্রয় হওয়া সময় পড়াশোনায় কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
বিশেষ করে ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যাতায়াত সহজ হলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ার পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতি মনোযোগও বাড়তে পারে বলে তাদের ধারণা।
কলারোয়ার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধা বিকাশের প্রতিযোগিতা তৈরি এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতেই জেলা পরিষদের এ উদ্যোগ। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে জেলা পরিষদ থাকবে।
এ সময় তিনি কলারোয়া পাইলট হাইস্কুলে শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল রাখার জন্য একটি সাইকেল শেড নির্মাণে দুই লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন।
শনিবার জেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন হাবিবুল ইসলাম হাবিব। বিশেষ অতিথি ছিলেন আলিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুর রউফ।
জেলা পরিষদ সূত্রে আরও জানা যায়, বাইসাইকেল বিতরণের পাশাপাশি মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে শুধু শ্রেণিকক্ষ বা পাঠ্যবই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর সুযোগ, আর্থিক সক্ষমতা এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল দেওয়ার উদ্যোগ তাদের মেধার স্বীকৃতির পাশাপাশি বিদ্যালয়ে যাতায়াতের বাস্তব সমস্যারও একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে বাইসাইকেল পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও ভালো করার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি অন্য শিক্ষার্থীরাও ভালো ফলাফলের জন্য উৎসাহিত হবে। ফলে বাইসাইকেলটি শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরির অনুপ্রেরণাও হয়ে উঠতে পারে।
জেলা পরিষদের এমন উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকলে সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা আরও বেশি উপকৃত হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।