মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে রোগী আনার চার মিনিটের মধ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ও পরে মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছিল। তবে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, স্বজন, চিকিৎসক ও কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট আটজনের বক্তব্য গ্রহণ এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলার কারণে মমতাজ বেগম (৫০) নামের ওই রোগীর মৃত্যু হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে জরুরি চিকিৎসা দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।
গত ২৯ আগস্ট দুপুরে ঘিওর উপজেলার শ্রীবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মমতাজ বেগমকে শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে আনা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ১টা ২৮ মিনিটে তিনি হাসপাতালে পৌঁছান। এক মিনিট পর তাঁর স্বামী ও এক ভাতিজি তাঁকে জরুরি বিভাগের একটি চেয়ারে বসান। ১টা ৩০ মিনিটে তাঁর স্বামী টিকিট কাটতে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার তোফায়েল আহমেদের টেবিলের দিকে যান। এর দুই মিনিট পর, ১টা ৩২ মিনিটে চেয়ার থেকে নিচে ঢলে পড়েন মমতাজ বেগম।
রোগীর মৃত্যুর পরদিন ৩০ আগস্ট তাঁর নাতি সাগর মিয়া শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. শাম্মি আক্তার ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার তোফায়েল হোসেনের বিরুদ্ধে রোগীকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া এবং অনুরোধের পরও সময়মতো চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগ পাওয়ার দিনই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইসমত জাহান ভূইয়া। কমিটির সভাপতি করা হয় মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. মানবেন্দ্র সরকারকে। শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক তপরেশ বিশ্বাসকে সদস্যসচিব এবং চিকিৎসক মুনতাসির রহমানকে কমিটির সদস্য করা হয়।
সিসিটিভিতে যা দেখা গেছে
তদন্ত কমিটি রোগীর স্বজন, চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মচারীসহ আটজনের লিখিত বক্তব্য নেয়। পাশাপাশি ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১টা ২৮ মিনিটে মমতাজ বেগম জরুরি বিভাগে প্রবেশ করেন। এক মিনিট পর তাঁর স্বামী ও ভাতিজি তাঁকে চেয়ারে বসান। ১টা ৩০ মিনিটে তাঁর স্বামী চিকিৎসার টিকিট কাটতে যান। এর দুই মিনিট পরই রোগী চেয়ার থেকে নিচে ঢলে পড়েন।
তদন্ত কমিটির ভাষ্য, ওই সময় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছিলেন। রোগী ঢলে পড়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে জরুরি চিকিৎসা দেন এবং জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন। চিকিৎসকের সামর্থ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার পরও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসকের ওপর হামলার অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনেরা কয়েকজন আত্মীয়কে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আনুমানিক দুপুর ২টার দিকে তাঁদের কয়েকজন জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালনরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার তোফায়েল আহমেদের ওপর শারীরিক হামলা ও প্রাণনাশের চেষ্টা করেন বলে তদন্ত কমিটি উল্লেখ করেছে।
এতে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের উপস্থিতিতে বিকেল ৩টা ৩৯ মিনিটের দিকে মমতাজ বেগমের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্ত
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগকারী ও অভিযুক্তদের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্য, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কমিটির সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, চিকিৎসায় অবহেলার কারণে মমতাজ বেগমের মৃত্যুর অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ডা. শাম্মি আক্তার বলেন, সেদিন তাঁরা রোগীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর স্বজনেরা বাইরে থেকে লোকজন এনে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেন এবং একপর্যায়ে হাসপাতালের একজন সেকমোর ওপর শারীরিকভাবে হামলা করা হয়।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় চিকিৎসকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে পরবর্তীতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, সেই শঙ্কা কাজ করে।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ডা. বদরুল আলম বলেন, ভুল চিকিৎসা কিংবা অবহেলার অভিযোগ তুলে চিকিৎসকদের ওপর হামলা চিকিৎসাসেবাকে ব্যাহত করে। চিকিৎসকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে এর প্রভাব রোগীদের চিকিৎসার ওপরও পড়ে।
তিনি চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত চিকিৎসক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের দাবি জানান।
মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আইভী ফেরদৌস বলেন, এ ধরনের ঘটনা চিকিৎসকদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তাঁদের মধ্যে ভীতি তৈরি করে। চিকিৎসকদের নিরাপদ ও নির্ভয় কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীর মৃত্যু পৃথিবীর সব দেশেই ঘটে। তবে চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে চিকিৎসকের ওপর হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।