শিরোনাম

১৩০ কোটি টাকার অবকাঠামো অব্যবহৃত, থমকে চিলাহাটি সীমান্ত বাণিজ্য

১৩০ কোটি টাকার অবকাঠামো অব্যবহৃত, থমকে চিলাহাটি সীমান্ত বাণিজ্য

আধুনিক টার্মিনাল ভবন, আন্তর্জাতিক রেলপথ, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সুবিধা—সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণের সব আয়োজনই রয়েছে। কিন্তু নেই কর্মচাঞ্চল্য, নেই পণ্যবাহী ট্রেনের আনাগোনা কিংবা যাত্রীদের পদচারণা। নীলফামারীর চিলাহাটিতে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সীমান্ত বাণিজ্য ও রেল যোগাযোগের অবকাঠামো পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। কার্যক্রম বন্ধ থাকায় একদিকে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ কাজে আসছে না, অন্যদিকে সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্থানীয় অর্থনীতিতেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায় চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ। দীর্ঘ ৫৫ বছর পর ২০২১ সালে পুনরায় এই রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে ভারতের শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়িসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চিলাহাটিতে নির্মাণ করা হয় আধুনিক রেল ইয়ার্ড, আন্তর্জাতিক মানের প্ল্যাটফর্ম, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ভবন, ওভারব্রিজ এবং সংযোগ সড়ক। এসব অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। তবে সরকারি ব্যয় সংকোচননীতির আওতায় অন্তর্বর্তী সরকারের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বন্দরটির কার্যক্রম স্থগিত করা হলে থেমে যায় সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগের অগ্রযাত্রা।

৮০ কোটি টাকার রেল অবকাঠামো পড়ে আছে

চিলাহাটি রেল ইয়ার্ডের মেইন লাইন ও একাধিক লুপ লাইনসহ ব্রডগেজ রেল অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আন্তদেশীয় ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় এসব অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নেই। রেললাইনের বিভিন্ন অংশে মরিচা ধরার পাশাপাশি কোথাও কোথাও আগাছা ও জঙ্গল গজিয়ে উঠেছে।

৪০ কোটি টাকার ভবনেও নেই কর্মচাঞ্চল্য

আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা ও পণ্য পরিবহনের আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন টার্মিনাল ভবন, আধুনিক কাস্টমস স্টেশন ও ইমিগ্রেশন সুবিধা। কিন্তু প্রত্যাশিত কার্যক্রম চালু না থাকায় ভবন ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন স্থানে ধুলোর আস্তরণ জমেছে, দেয়ালে দেখা দিয়েছে শ্যাওলা। এতে মূল্যবান সরঞ্জাম ও স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

১০ কোটি টাকার ওভারব্রিজ ও সড়কও অকার্যকর

যাত্রীদের চলাচল এবং ভারী পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে নির্মিত ওভারব্রিজ ও সংযোগ সড়ক তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। বন্দর ও রেল যোগাযোগের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এসব অবকাঠামোও প্রত্যাশিত কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাগুলোর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার রহমান (৪৫) বলেন, হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি করা এই সীমান্ত পয়েন্টে শতকোটি টাকার সরকারি সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে আছে। দ্রুত পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল চালু করা না হলে এসব অবকাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার রুহুল আমিন বলেন, ২০২১ সাল থেকে মূলত ভারত থেকে পাথরবোঝাই মালবাহী ট্রেন বাংলাদেশে আসত। মাসে চার থেকে পাঁচটি ট্রেন চলাচল করত। ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতে পাথরের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি কমতে থাকে। একপর্যায়ে পাথরবাহী ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যাত্রীবাহী ট্রেনটির চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।

আয় কমেছে অর্ধেকেরও বেশি

চিলাহাটি দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ হওয়ায় রেলওয়ের আয়েও প্রভাব পড়েছে। স্টেশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পাথরবাহী ট্রেনের প্রতিটি চালান থেকে পাথরের পরিমাণভেদে রেলওয়ে ভাড়া বাবদ ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা আয় করত। মাসে এ আয় দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা।

স্টেশনের আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আয় হয়েছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা। দুই বছর পর ২০২৫ সালের একই মাসে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে স্টেশনের মাসিক আয় কমেছে ৪৫ লাখ টাকা।

বিনিয়োগ করে বিপাকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা

চিলাহাটি স্থলবন্দর ও রেল যোগাযোগকে কেন্দ্র করে নীলফামারী, সৈয়দপুর এবং আশপাশের এলাকায় পরিবহন, আবাসন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ীরা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রত্যাশায় অনেকে ব্যাংকঋণ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করেন। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের বিনিয়োগ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী তোজাম্মেল হোসেন বলেন, “আমরা ব্যাংকঋণ নিয়ে ইমিগ্রেশন ও বন্দরের ব্যবসাকে ঘিরে বেশ কিছু অবকাঠামো তৈরি করেছিলাম। বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা নিঃস্ব হতে বসেছি। রাষ্ট্রীয় এই সম্পদ ফেলে না রেখে অবিলম্বে চালু করা দরকার।”

নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুব-উর-রহমান জানান, চিলাহাটি স্থলবন্দর পুনরায় চালু হলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নতুন করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ পাবেন। এতে তাঁদের বিনিয়োগের সুফল পাওয়ার পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে।

স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, চিলাহাটি রুট কার্যকরভাবে চালু থাকলে বাংলাদেশের মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এবং নেপালের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও দূরত্ব কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে।

চালুর সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে

বন্দরটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মো. হুমায়ূন কবীর বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব মূলত অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। স্থলবন্দর ও রেলপথ পুনরায় চালুর বিষয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তাঁদের নেই। এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রেল ও সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সহযোগিতা প্রয়োজন। কাস্টমস ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ও জরুরি।

শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো অব্যবহৃত থেকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই কার্যকর উদ্যোগ চান স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত পদক্ষেপে চিলাহাটি রুটে রেল যোগাযোগ ও সীমান্ত বাণিজ্য আবারও চালু হবে। এতে সরকারি বিনিয়োগের ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতেও নতুন গতি ফিরতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর