সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকার একটি মাছের ঘেরের বাসা থেকে যৌথ অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ফজলুল হক আমিনী (৪৫) দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া এলাকার মৃত রুহুল আমিনের ছেলে। শনিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, দেবহাটা সার্কেল, দেবহাটা থানা ও কালীগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যদের পাশাপাশি এসআরবি-৬-এর সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে আমিনীকে গ্রেপ্তার করেন। পরে তাঁকে দেবহাটা থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পুলিশ জানায়, এ মামলায় এর আগে আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে মামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।
যেভাবে প্রাণ হারান শামীম
পুলিশ ও মামলাসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে কয়েক দফায় মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামছুর রহমান সানার ছেলে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শামীম ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে একপর্যায়ে শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। পরে স্থানীয় একটি বাজারে তাঁকে প্রথম দফায় মারধর করা হয়।
পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একদল লোক তাঁকে সেখান থেকে বের করে আবারও মারধর করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
মামলাসংশ্লিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন রাতে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে একটি মিছিল নিয়ে হাসপাতালে হামলা চালানো হয়। এ সময় চিকিৎসাধীন শামীমকে হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে আবারও গণপিটুনি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।
মামলায় ১০ জনের নাম, অজ্ঞাতনামা আসামি ২৫০-৩০০
শামীম হত্যার ঘটনায় তাঁর বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মামলা দায়েরের পর থেকে আমিনী আত্মগোপনে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবিতে নিহতের পরিবারের সদস্যরাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
আগের কয়েকটি ঘটনায়ও তাঁর নাম আসার অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেবহাটার পারুলিয়া এলাকায় বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণজমায়েত ও মারধরের ঘটনায় ফজলুল হক আমিনীর নাম উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৫ সালের মে মাসে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পারুলিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলামকে মারধর করা হয়। একই বছরের অক্টোবরে সোহাগ হোসেন নামের এক যুবকের বাড়িতে হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া পারুলিয়া ইউনিয়নের এক সদস্যের বাড়িতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে লোকজন জড়ো করার ঘটনায় আমিনীর সংশ্লিষ্টতা ছিল। শামীম হত্যার ঘটনাতেও ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার এবং লোকজন জড়ো করে উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তারের পর তদন্তের অগ্রগতি ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।