মানিকগঞ্জে চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বছরের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত জেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১ হাজার ৩৬২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। গত দুই বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। একই সময়ে বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী। চলতি বছর ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া গেছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুড়ী ইউনিয়নের শোলধারা গ্রামের রাব্বি হোসেন (১৮) ও মানিকগঞ্জ পৌরসভার চর বেউথা এলাকার সানি (২৭) রয়েছেন। দীর্ঘদিন জ্বরে ভোগার পর গত ৫ অক্টোবর রাব্বিকে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বারান্দায় তাঁর চিকিৎসা চলছে। অন্যদিকে ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় জ্বর নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন সানি। এর আগে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে রক্ত পরীক্ষা করালে তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।
মানিকগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দৈনিক ডেঙ্গু প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত জেলার সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ১৪ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৩৪৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬২ জনে।
২০২৫ সালের একই সময়ে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ২৪৩ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে ১১৯ জন, যা প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৬০১ জন বা প্রায় ৭৯ শতাংশ।
হাসপাতালে ভর্তি ৯৮ জন
৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৬ জন, মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৯, সদর হাসপাতালে ১৯, সাটুরিয়ায় ৮ এবং ঘিওরে ৬ জন চিকিৎসাধীন।
এ পর্যন্ত হাসপাতালগুলো থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১ হাজার ২৬৪ জন। গত বছরের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৩ জন এবং ২০২৪ সালে ছিল ৮৪ জন। সেই হিসাবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়েছে ৪৫ জন বা প্রায় ৮৫ শতাংশ।
তিন হাসপাতালেই শনাক্ত প্রায় ৭১ শতাংশ
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ৩৪৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এরপর মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩২৮ এবং সদর হাসপাতালে ২৯৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
এ ছাড়া সাটুরিয়ায় ১৬০, ঘিওরে ৬৪, শিবালয়ে ৪৭, সিংগাইরে ৪৪, হরিরামপুরে ৪৪ এবং দৌলতপুরে ৩২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
মুন্নু মেডিকেল কলেজ, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও সদর হাসপাতালে মোট ৯৭১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। জেলার মোট শনাক্ত রোগীর প্রায় ৭১ শতাংশই এই তিন প্রতিষ্ঠানে।
এক বছরে আক্রান্ত বেড়েছে ১১৯ জন
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত মানিকগঞ্জে সরকারি হাসপাতালে ৯৭০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ২৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন। মোট রোগী ছিল ১ হাজার ২৪৩ জন।
চলতি বছরের একই সময়ে সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ১৪ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৩৪৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে সরকারি হাসপাতালে আক্রান্ত বেড়েছে ৪৪ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বেড়েছে ৭৫ জন।
দুই বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ
২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত মানিকগঞ্জে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ৭৬১ জনের। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৪৩ জনে। চলতি বছরের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত তা আরও বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৬২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত মানিকগঞ্জে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কোনো তথ্য ছিল না। তবে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।
বৃষ্টিপাত ও জমে থাকা পানিকে দায়ী করছেন চিকিৎসক
মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক মানবেন্দ্র সরকার বলেন, আগের তুলনায় ডেঙ্গুর প্রজননক্ষমতা বেড়েছে। এবার প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। পাশাপাশি মানুষের অসচেতনতার কারণেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
মেডিসিন বিভাগের এই চিকিৎসক বলেন, জ্বর হলে প্রথম তিন দিন পর্যাপ্ত তরলজাতীয় খাবার ও ফলমূল খাওয়া উচিত। জ্বর না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করতে হবে। এরপরও জ্বর অব্যাহত থাকলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জ্বরের সঙ্গে পেটে ব্যথা বা বমি হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি। সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব সিভিল সার্জনের
মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আইভী ফেরদৌস বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালে তাঁদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে রোগ নিয়ন্ত্রণে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, বাড়ির আঙিনা ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার, জ্বর হলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।