বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা, সরকারি কাজে বাধা ও নিরাপত্তাকর্মীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আল-বেরুনী মীর এ আদেশ দেন। তবে রিমান্ড শুনানির সময় আদালতকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং পরে তাঁদের বের করে দেওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা—আসামিপক্ষ বলছে, সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া নিন্দনীয়; রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আসামির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই বিচারক অন্যদের আদালতকক্ষ ছাড়ার নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলাম আখতারুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দেয়। অন্যদিকে আসামিপক্ষ রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালতকক্ষে সাংবাদিক প্রবেশ নিয়ে বিতর্ক
আখতারুজ্জামানকে আদালতে হাজির করা হবে জানতে পেরে শনিবার আদালত প্রাঙ্গণে অর্ধশতাধিক সাংবাদিক উপস্থিত হন। তাঁদের অভিযোগ, নিচতলা থেকে আদালতের দিকে যাওয়ার সময় পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। পরে এজলাসের প্রবেশপথেও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাঁদের আটকে দেন।
দায়িত্বরত এক এসআইয়ের কাছে বাধার কারণ জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। এ বিষয়ে ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মহীউদ্দিন মাহমুদ সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধার বিষয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ করতে না দেওয়া নিন্দনীয়। কিছু গোপন করার জন্য এমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা তিনি জানেন না।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, সাংবাদিকদের আদালতকক্ষে প্রবেশে প্রসিকিউশন বিভাগের ডিসি কোনো বাধা দেননি। তাঁর ভাষ্য, শুনানির সময় আখতারুজ্জামান প্রসিকিউশন, বিচারক ও পুলিশের প্রতি ‘মারমুখী’ আচরণ করছিলেন এবং আইনজীবী ছাড়া অন্য কেউ যেন আদালতকক্ষে না থাকেন, এমন বক্তব্য দেন। পরে তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই বিচারক সবাইকে বের হয়ে যেতে বলেন বলে দাবি করেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে
পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে বাধা, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আঘাতের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, ঘটনার পেছনে কোনো মহলের ইন্ধন ছিল কি না, তা উদ্ঘাটনসহ মামলার বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য জানতে আখতারুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। তবে আদালত পাঁচ দিনের আবেদন মঞ্জুর না করে এক দিনের রিমান্ড দিয়েছেন।
মামলায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর সৌদি আরবের মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইট ঢাকায় আসে। যাত্রীরা নামার পর ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। এতে লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
পুলিশের ভাষ্য ও এজাহারে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি দেখতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ সেখানে গেলে আখতারুজ্জামান তাঁর দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং তাঁকে মারধর ও ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণ করছিলেন। নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন এতে বাধা দিলে আখতারুজ্জামান তাঁকে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ছাড়া জমজমের পানির বোতল ছুড়ে ফেলা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগ মামলার এজাহার ও পুলিশের বক্তব্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
আদালত থেকে বের করার সময় হেলমেট নিয়ে আপত্তি
রিমান্ড মঞ্জুরের পর আখতারুজ্জামানকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আদালত থেকে বের করে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাঁকে হেলমেট পরানোর চেষ্টা করলে তিনি তা খুলে ছুড়ে ফেলেন বলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকেরা জানান।
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, তাঁকে অন্যায় ও অবৈধভাবে হেলমেট পরানো হচ্ছে। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলেও দাবি করেন। হেলমেটের পরিবর্তে হাতকড়া পরানোর কথাও পুলিশকে বলেন তিনি।
গ্রেপ্তার ও জামায়াতের বক্তব্য
এর আগে শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টের ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে তাঁকে বিমানবন্দর থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের পর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর মুক্তি দাবি করেন। এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে অন্যান্য যাত্রীর মতো আখতারুজ্জামানও ভোগান্তির শিকার হন এবং এর প্রতিবাদে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে যোগ দেন। এর আগে তিনি বিএনপির মনোনয়নে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।