শিরোনাম

যিনি মানুষের অধিকার ও বেঁচে থাকার কথা লিখতেন, আজ তিনিই বাঁচার লড়াইয়ে

যিনি মানুষের অধিকার ও বেঁচে থাকার কথা লিখতেন, আজ তিনিই বাঁচার লড়াইয়ে

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কলম ও ক্যামেরা হাতে মানুষের গল্প তুলে ধরেছেন তিনি। অবহেলিত, নির্যাতিত ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছেন, মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন। অথচ আজ সেই সাংবাদিক নিজেই জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে অসহায়। সব কষ্টের মধ্যেও তাঁর একটাই আকুতি—সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে ফাতিমার মুখের দিকে তাকিয়ে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকা।

তিনি পঞ্চগড় শহরের বাসিন্দা সাংবাদিক সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ। স্ত্রী, দুই কিশোর ছেলে ও সাত বছরের মেয়ে ফাতিমাকে নিয়ে তাঁর পাঁচ সদস্যের পরিবার। দীর্ঘদিনের কিডনি রোগ, নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ব্যয় এবং আর্থিক সংকটে এখন মানবেতর জীবন কাটছে পরিবারটির।

১৯৯১ সালের দিকে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই বড় ভাইয়ের মাধ্যমে দিনাজপুরের দৈনিক প্রতিদিন পত্রিকায় কাজ শুরু করেন সাজ্জাদ। সেখান থেকেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশের প্রথম সারির একাধিক সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। দৈনিক সকালের খবর, মুক্তকণ্ঠ, জনকণ্ঠ, যুগান্তর, আমার দেশ, সমকাল, নিউ নেশন ও ডেইলি সান পত্রিকায় কাজ করেছেন তিনি। অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য রিপোর্ট, বাংলানিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনেও জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০০০ সাল থেকে বার্তা সংস্থা ইউএনবি, ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভি এবং ২০১৬ সাল থেকে দৈনিক ইত্তেফাকে কর্মরত রয়েছেন এই সংবাদকর্মী। তাঁর হাত ধরে সাংবাদিকতায় দীক্ষা নেওয়া অনেক তরুণ এখন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করছেন।

সাজ্জাদের পরিবার ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তাঁর কিডনি রোগের বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর শুরু হয় চিকিৎসা। উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতেও গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। বর্তমানে তাঁর দুটি কিডনিই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকেরা নিয়মিত ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করা প্রয়োজন। কিন্তু আর্থিক সংকটে এখন নিয়মিত সেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না তিনি। কখনো সপ্তাহে এক দিন, কখনো দুই দিন ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন। একবার ডায়ালাইসিসে খরচ হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। ওষুধসহ চিকিৎসা চালাতে প্রতি মাসে প্রয়োজন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।

চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ইতিমধ্যে নিজের সঞ্চয় ও সহায়-সম্বল শেষ করেছেন সাজ্জাদ। বিক্রি করেছেন সাংবাদিকতার প্রধান উপকরণ ল্যাপটপ ও শখের ক্যামেরাও। ধারদেনা করে এত দিন চিকিৎসা চালালেও এখন আর সেই সামর্থ্য নেই। পরিবারের শেষ সম্বল ভিটেবাড়ি আঁকড়ে ধরে কোনোভাবে দিন পার করছেন তিনি।

পঞ্চগড় সোনারবাংলা কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারের চিকিৎসক আরিফুজ্জামান আরিফ বলেন, দিন দিন সাংবাদিক সাজ্জাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করা প্রয়োজন হলেও অর্থাভাবে তিনি কখনো এক দিন, কখনো দুই দিন করাচ্ছেন। তাঁর নিয়মিত ওষুধ সেবনের পাশাপাশি সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করা জরুরি। দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

সাজ্জাদ বলেন, “আমার এখন প্রতি মাসে ডায়ালাইসিসসহ চিকিৎসার পেছনে খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো আমার কাছে আর কিছুই নেই। সবই শেষ হয়েছে অনেক আগে। ধারদেনাও হয়ে গেছে অনেক। ডাক্তার দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেই সামর্থ্য আমার নেই।”

নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমার মেয়েসহ তিন সন্তান এখনো শিক্ষার্থী। সাংবাদিকতা ছাড়া আমার আয়ের আর কোনো উৎস নেই। এখন সন্তানদের মুখে ঠিকমতো খাবারও তুলে দিতে পারছি না। জীবনের শেষ বেলায় এমন অসহায়ত্ব বরণ করতে হবে, কখনো ভাবিনি। সাংবাদিকতা করে জীবনে অনেক সম্মান পেয়েছি। অনেক দুঃখী মানুষের কথা লিখেছি। আজ আমিই তাদের কাতারে দাঁড়িয়েছি। মানুষের সহায়তা ছাড়া আমার আর বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই।”

মেয়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাজ্জাদ। তিনি বলেন, “কষ্ট লাগে শুধু মেয়েটার জন্য। অতটুকু মেয়ে আমার। তাকে আরেকটু বড় দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম। তার মুখের দিকে তাকালেই আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছা করে।”

সাত বছরের ফাতিমা বিনতে সাজ্জাদও বাবার চিকিৎসার জন্য সবার কাছে আকুতি জানিয়েছে। সে বলে, “আমার বাবার অসুখ হয়েছে। আমার কিছু ভালো লাগে না। বাবার কাছে টাকা নেই। চিকিৎসা না হলে আমার বাবা বাঁচবে না। আমার বাবাকে আপনারা বাঁচান।”

সাজ্জাদের বড় ভাই সহিদুল ইসলাম শহীদ বলেন, তাঁর ছোট ভাই পঞ্চগড় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশনে কাজ করেছেন, এখনো করছেন। কিন্তু তাঁর কিডনি রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। গত তিন বছর ধরে পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার ব্যয় বহনের চেষ্টা করা হলেও এখন আর সেই খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

পঞ্চগড় প্রেসক্লাবের সভাপতি বলেন, সহকর্মী সাজ্জাদের অসুস্থতা নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন তাঁরা এবং কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। আর্থিক সংকটে এই মেধাবী সাংবাদিক নিজের চিকিৎসা চালাতে পারছেন না, পারিবারিকভাবেও অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাঁর চিকিৎসায় সহায়তার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী এবং বিশেষ করে গণমাধ্যমকর্মীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

যে মানুষটি দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে অন্যের অধিকার, বঞ্চনা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন, আজ তাঁর নিজের জীবনই নির্ভর করছে মানুষের সহযোগিতার ওপর। সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ ও তাঁর পরিবারের প্রত্যাশা, সহৃদয় মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে আবারও চিকিৎসার সুযোগ পাবেন তিনি।

মানুষ মানুষের জন্য—সাংবাদিক সাজ্জাদের চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবেন কি কেউ?

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর