যে বয়সে সন্তান-স্বজনের ভালোবাসা, মমতা আর নিরাপদ আশ্রয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটানোর কথা, সেই বয়সেই অনেকের ঠাঁই হয়েছে পথে-প্রান্তরে। আপনজনের অবহেলা ও নির্মমতায় যাদের জীবন হয়ে উঠেছিল অনিশ্চিত, তাদের জন্য নিজের ঘরের দরজা খুলে দিয়েছেন রংপুরের রাজেকা রহমান।
বয়স্কদের আশ্রয় দেওয়ার ‘অপরাধে’ ভেঙে গেছে তার ২১ বছরের সংসার। স্বামী ছেড়ে গেলেও থেমে যাননি তিনি। বরং রক্তের বন্ধন ছেঁড়া অসহায় বৃদ্ধদের নিজের মায়ের মমতায় আগলে নিয়েছেন। তাদের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র’।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার দেবী চৌধুরানী বাজারে ৩০ শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছে কেন্দ্রটি। আধাপাকা আটটি ঘরে বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন অসহায় প্রবীণরা। কারও সন্তান নেই, কারও সন্তান থেকেও নেই; কেউ আবার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়েছেন সম্পূর্ণ একা। তাদের সবার ঠিকানা এখন রাজেকার এই আশ্রম।

সন্তান থেকেও যাদের কেউ নেই
আশ্রমে আশ্রয় নেওয়া ৬৬ বছর বয়সী বাছির উদ্দিনের ঘর, সংসার ও সন্তান ছিল। কিন্তু বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই মানুষটিকে সন্তানরা মসজিদে ফেলে রেখে যান। প্রায় ১০ মাস একা জীবন কাটানোর পর শেষ পর্যন্ত তার ঠিকানা হয় রাজেকার আশ্রমে। এখন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এখানেই থাকতে চান তিনি।
হারাগাছের মজিবর, পীরগাছার মজিবুর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের রমিসা ও কাউনিয়ার রাবেয়া খাতুনের গল্পও প্রায় একই। যাদের গর্ভে ১০ মাস ১০ দিন ধারণ করে সন্তানদের পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলেন, সেই সন্তানদের কাছেই জীবনের শেষ বয়সে তারা হয়ে গেছেন পর।
তিন বেলা পেটপুরে খাওয়ার জন্য কথায় কথায় খোঁটা, মানসিক নির্যাতন, এমনকি শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন অনেকে। তবুও প্রিয় সন্তানদের প্রতি তাদের কোনো অভিযোগ নেই। সবকিছুকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন তারা। বুকভরা কষ্ট নিয়েও দুই হাত তুলে দোয়া করেন—সন্তানরা যেন ভালো থাকে, দুধে-ভাতে থাকে।

তিন বৃদ্ধ থেকে শতাধিক মানুষের আশ্রয়
রাজেকা রহমানের নিজের জীবনও কম বেদনাময় নয়। আপনজনদের নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতাই একসময় তার মনে মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে।
২০১৪ সালে মাত্র তিনজন বৃদ্ধকে নিয়ে শুরু করেছিলেন মানবিক এই উদ্যোগ। সেই ছোট্ট উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে অর্ধশতাধিক অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থলে। একসময় শতাধিক বয়স্ক মানুষও এই কেন্দ্রে আশ্রয় পেয়েছেন।
এতিম শিশু-কন্যাসহ এখন রাজেকাই এসব মানুষের ‘মা’। বসন্ত হারানো এসব মানুষের জীবনে মায়ের মমতা হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
বৃদ্ধদের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে প্রতি মাসে তার খরচ হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। নিয়মিত বড় কোনো সহায়তা না পেলেও নিজের উপার্জনের টাকা দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছেন এই মানবিক প্রতিষ্ঠান।

অর্থসংকটেও থামেনি পথচলা
অর্থের অভাবে কখনো কখনো থমকে দাঁড়ায় কেন্দ্রের কার্যক্রম। কিন্তু ভেঙে পড়েন না রাজেকা। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই আবার নতুন করে শুরু করেন পথচলা। একটু একটু করে এগিয়ে নিচ্ছেন আশ্রমটিকে।
রাজেকার কাছে এসব বৃদ্ধ শুধু আশ্রিত নন; তারা তার পরিবারের সদস্য। কারও মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, অসুস্থতার সময় পাশে বসে থাকা কিংবা কারও মুখে হাসি ফোটাতে নিজের কষ্ট ভুলে যাওয়া—এভাবেই কাটে তার প্রতিদিন।
যাদের জীবনের শেষ ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল আপনজনের ঘর, তাদের অনেকের শেষ আশ্রয় এখন রাজেকার ‘মায়ের আঁচল’। নিজের সংসার হারিয়ে তিনি যেন খুঁজে নিয়েছেন আরও বড় এক পরিবার—যেখানে রক্তের সম্পর্ক নেই, কিন্তু আছে মায়া, ভালোবাসা ও মানবিকতার অটুট বন্ধন।

আরও বড় করার স্বপ্ন
আগামী দিনে কেন্দ্রটি আরও বড় করতে চান রাজেকা। তার স্বপ্ন, আরও বেশি বঞ্চিত ও নিপীড়িত বৃদ্ধ মানুষ যেন এখানে আশ্রয় পান। তবে একার পক্ষে এই বিশাল দায়িত্ব বহন করা কঠিন।
তাই সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের প্রতি তার আহ্বান—মানবিক এই উদ্যোগের পাশে দাঁড়ান। অর্থ দিয়ে না পারলেও সহমর্মিতা দিয়ে পাশে থাকুন।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কোনো মানুষ যেন নিজেকে পরিত্যক্ত মনে না করেন—এটাই রাজেকার স্বপ্ন। নিজের ২১ বছরের সংসার হারিয়ে শত মানুষের মা হয়ে ওঠা এই নারী যেন প্রমাণ করেছেন, মানুষের পাশে দাঁড়াতে সবসময় বড় সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় শুধু একটি বড় হৃদয়ের।