শিরোনাম

নীলফামারীতে একই ধানগাছ থেকে দুবার ফলন, মুড়ি ধান চাষে নতুন সম্ভাবনা

নীলফামারীতে একই ধানগাছ থেকে দুবার ফলন, মুড়ি ধান চাষে নতুন সম্ভাবনা

একবার ধান রোপণ করে একই গাছের গোড়া থেকে দ্বিতীয়বার ধান উৎপাদন করছেন নীলফামারীর কৃষকেরা। ‘রেটুন ক্রপ’ বা ‘মুড়ি ধান’ নামে পরিচিত এ পদ্ধতিতে নতুন করে চারা রোপণ ছাড়াই অতিরিক্ত ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি স্বল্প সময়ে বাড়তি আয় করতে পারছেন কৃষকেরা।

নীলফামারীর মুন্সিপাড়া গ্রামের নারী কৃষক শামিমা নাসরিন এ পদ্ধতিতে সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি তাঁর ৩৪ শতক জমিতে ব্রি ধান-৯৮ জাতের ধান চাষ করেন। পরে গোখাদ্যের চাহিদা থাকায় প্রথম দফায় পুরো কাঁচা ধানগাছ ১৬ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। এরপর জমিতে ধানগাছের গোড়া বা নাড়া রেখে নিয়ম অনুযায়ী সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা করেন। সেই গোড়া থেকেই নতুন কুশি বের হয়ে এখন ধানের শীষ ধরেছে।

একবার চারা রোপণ করেই একই জমি থেকে দ্বিতীয় দফায় ধান পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় খুশি এই কৃষক। তাঁর মতো অন্য কৃষকেরাও পদ্ধতিটি অনুসরণ করলে বাড়তি খরচ ছাড়াই অতিরিক্ত ফসল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ধান কাটার পর জমিতে অবশিষ্ট গোড়া থেকে নতুন কুশি গজিয়ে যে দ্বিতীয় ফসল উৎপন্ন হয়, সেটিই মুড়ি ধান। এ পদ্ধতিতে পুনরায় বীজতলা তৈরি, জমি চাষ ও চারা রোপণের প্রয়োজন হয় না। ফলে সময়, শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকে।

মুড়ি ধান চাষে সফলতার জন্য মূল ধান কাটার সময় উপযুক্ত উচ্চতায় নাড়া রেখে দেওয়া এবং পরবর্তী পরিচর্যা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিবিষয়ক প্রচলিত নির্দেশনায় ধান কাটার পর জমির অবস্থা ও জাত অনুযায়ী সার প্রয়োগ, প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং রোগবালাই পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে নাড়া রাখার উচ্চতা, সার প্রয়োগের মাত্রা ও সেচের পরিমাণ ধানের জাত, মাটির উর্বরতা এবং স্থানীয় পরিবেশ অনুযায়ী নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

কৃষকদের মতে, এ পদ্ধতিতে নতুন করে জমি তৈরি ও চারা রোপণের খরচ না থাকায় উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে। মূল ফসলের তুলনায় দ্বিতীয় দফার ধান দ্রুত ঘরে তোলার সুযোগও রয়েছে। তবে অতিরিক্ত ফলন ও খরচ সাশ্রয়ের পরিমাণ জাত, আবহাওয়া, জমির অবস্থা এবং পরিচর্যার ওপর নির্ভর করে।

কামারপাড়ার কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, এ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি, জমি চাষ ও নতুন চারা রোপণের খরচ লাগে না। জমি প্রস্তুত, সেচ, সার ও শ্রমিকের খরচও কমে আসে। অল্প সময়ে একই জমি থেকে বাড়তি ফসল পাওয়ার সুযোগ থাকায় কৃষকেরা পদ্ধতিটির প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।

তবে মুড়ি ধান চাষে সফল হতে হলে উপযুক্ত জাত নির্বাচন জরুরি। যেসব জাতের গোড়া থেকে নতুন কুশি গজানোর ক্ষমতা বেশি এবং গাছ সহজে ঢলে পড়ে না, সেসব জাত এ পদ্ধতির জন্য তুলনামূলক উপযোগী হতে পারে। পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ পর্যবেক্ষণ করে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়রা মন্ডল বলেন, “এলাকার কৃষকেরা আউশ ও আমন ধান কাটার পরপরই মুড়ি ধানের চাষ করতে পারেন। অল্প দিনেই এ ধান ঘরে তোলা সম্ভব। এরপর জমিতে দেরিতে চাষযোগ্য আলুর জাতও আবাদ করা যেতে পারে। এতে জমি ও সময়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবেন।”

কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং বাড়তি ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনার কারণে মুড়ি ধান চাষ নীলফামারীর কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এ পদ্ধতির প্রকৃত লাভ নির্ধারণে জাতভিত্তিক ফলন, উৎপাদন ব্যয় ও কৃষকের আয় নিয়ে মাঠপর্যায়ে আরও তথ্য সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর