সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়ালেও বিষয়টি অস্বীকার করেছে নজরুলের পরিবার। তাঁর বাবা আব্দুল বাছিরের দাবি, সুইটি আক্তারকে তাঁরা চেনেন না। ছেলের সঙ্গে ওই তরুণীর বিয়ের বিষয়েও পরিবারের কোনো তথ্য নেই।
নজরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের ভাষ্য, আর্থিক সংকট কাটাতে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর ২৫ বছর বয়সে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর গ্রেপ্তার হন। এরপর তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি ছিলেন। তবে কী অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারেনি পরিবার।
আব্দুল বাছির বলেন, পরিবারের হাল ধরার আশায় কলেজে পড়ার সময় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সৌদি আরবে গিয়ে সে বিয়ে করেছে—এমন কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই। সুইটি আক্তারের সঙ্গে নজরুলের একই জায়গায় কাজ করার কথা শুনেছেন বলে জানান তিনি।
ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন আব্দুল বাছির। নজরুল সৌদি আরবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র ছয় মাস। এর মধ্যে পরিবারকে দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন। পরে কারাবন্দি হয়ে পড়ায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে বিপাকে পড়ে পরিবারটি। আব্দুল বাছির জানান, ঋণদাতারা এখন তাঁর ওপর টাকা ফেরত দেওয়ার চাপ দিচ্ছেন।
স্বজনদের দাবি, দীর্ঘ কারাবাসের পর গত বুধবার সৌদি কর্তৃপক্ষ নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন আব্দুল বাছির। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে তার প্রতিকার চান তিনি।
আব্দুল বাছির বলেন, ‘আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই। আমার ছেলেকে বিনা কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকলে এর বিচার চাই।’
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিরামপুর গ্রামের বাড়িতে প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াত বেড়েছে। উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে শোকের পাশাপাশি ঋণের বোঝা নিয়েও উদ্বেগে রয়েছে পরিবারটি।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি গাজী নিয়াজুল করিম। তাঁর দাবি, নজরুল এমন অপরাধ করেছেন বলে তিনি মনে করেন না, যার জন্য এ ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গাজী নিয়াজুল করিম। তাঁর অভিযোগ, নজরুলের পরিবারের সঙ্গে দূতাবাসের কেউ যোগাযোগ করেননি। তবে এ বিষয়ে দূতাবাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিনও ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তা জানা প্রয়োজন।
তবে নজরুল ও সুইটি আক্তারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, আদালতের রায় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আনুষ্ঠানিক নথি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের সম্পর্ক, অভিযোগের প্রকৃতি ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিবারের বক্তব্যের বাইরে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা, তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের জন্য বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।