মায়ের হাতে তৈরি আচারকে বাণিজ্যিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন রূপ নিয়েছে নিজস্ব কারখানায়। বয়সে ছোট হলেও উদ্যোগে বড় মানিকগঞ্জের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুবাশ্বির আমীন। তার প্রতিষ্ঠিত আচার ব্র্যান্ড ‘আচারে পাকা’ এখন নতুন পরিসরে এগিয়ে যাওয়ার পথে। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন দেখছে সে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ১০টায় মানিকগঞ্জের পশ্চিম বান্দুটিয়া এলাকায় ফিতা কেটে ‘আচারে পাকা’র নিজস্ব আচার তৈরির কারখানার উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খান।
একজন স্কুলশিক্ষার্থীর উদ্যোগে কারখানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে জামিলুর রশিদ খান বলেন, জীবনে অসংখ্য অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। তবে এ অনুষ্ঠানে এসে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সপ্তম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী, নাম মুবাশ্বির আমীন, সে এ রকম একটা উদ্যোগ নিয়েছে, জেনে সত্যি খুব ভালো লাগছে। আমি তার এই উদ্যোগের সফলতা কামনা করছি।”
মুবাশ্বিরের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পের শুরু ঘর থেকে। তার মা সুমাইয়া আক্তার পরিবারের সদস্যদের জন্য বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরি করতেন। মায়ের তৈরি সেই আচার আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চিন্তা থেকেই ব্যবসার পরিকল্পনা করে মুবাশ্বির। পরিবারের সহযোগিতায় সেই পরিকল্পনাই ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে।
২০২৫ সালের ১৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসে ‘আচারে পাকা’। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় শুরু করা এই উদ্যোগের মাধ্যমে মুবাশ্বির নিজের আগ্রহকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে রূপ দেয়। ব্র্যান্ডটি সেইই ফুডসের একটি প্রিমিয়াম আচার ব্র্যান্ড।
প্রতিষ্ঠানটির যাত্রার শুরুতে মুবাশ্বিরের ভাবনা ছিল, পরিবারের জন্য তৈরি আচার যদি অন্য মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে কেমন হয়? সেই ভাবনা থেকেই মায়ের সহযোগিতায় আচার বাজারজাত করার উদ্যোগ নেয় সে। সময়ের সঙ্গে ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নিজ এলাকায় কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। শনিবার সেই পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন হলো।
মুবাশ্বিরের লক্ষ্য শুধু একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা কিংবা ব্যবসার পরিধি বাড়ানো নয়। নিজের এলাকায় আরও বড় পরিসরে কারখানা গড়ে তুলে অসংখ্য মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে চায় সে। কারখানা উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মুবাশ্বির বলে, মানিকগঞ্জে আরও বড় পরিসরে কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে চায় সে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলেও প্রত্যাশা তার।
মুবাশ্বিরের এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তার মা সুমাইয়া আক্তারের। পরিবারের জন্য আচার তৈরির অভিজ্ঞতাকে ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দিতে ছেলের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সুমাইয়া আক্তার বলেন, মানুষের জন্য, বিশেষ করে নারীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি।
তবে খাদ্যপণ্যের ব্যবসায় সম্প্রসারণের পাশাপাশি মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। আচার উৎপাদনে কাঁচামালের গুণগত মান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সঠিক সংরক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত মোড়কজাতকরণ ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘আচারে পাকা’র কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত সহায়তাকারী আরিফুল হক অনুষ্ঠানে বলেন, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনিও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এখন মুবাশ্বির আমীনের উদ্যোগের মধ্যে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতিফলন দেখতে পান তিনি।
আরিফুল হক আরও বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু হলেও কারখানা নির্মাণের আগেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সনদ নেওয়া হয়েছে। বিএসটিআই সনদসহ মানসম্পন্ন কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মুবাশ্বির আমীনের সঞ্চালনায় এবং আল-আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মুবাশ্বিরের মা ও নারী উদ্যোক্তা সুমাইয়া আক্তার, সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট বজলুর রহমান এবং আরিফুল হকসহ অন্যরা।